আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ড : কাল কি তবে মিশরের রূপকথা ছাপিয়ে সুইস প্রাচীরের রোমাঞ্চ?

আগামীকাল সকালে আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ড এর মহাকাব্যিক মহারণ।! মাঠের সবুজ ঘাস কিংবা থিয়েটারের কাঠের মঞ্চ নয়, ফুটবল মাঠই কখনো কখনো হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের সবচেয়ে তীব্রতম নাট্যমঞ্চ। যেখানে এক নিমেষে বদলে যায় নিয়তি, যেখানে ট্র্যাজেডি আর মহাকাব্য হাত ধরাধরি করে হাঁটে। আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের মধ্যকার সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি কেবল বুটের লড়াই ছিল না, তা ছিল যেন উইলিয়াম শেকসপিয়ারের কোনো না-লেখা অমর নাটকের জীবন্ত মঞ্চায়ন। আর সেই মহাকাব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই আলবিসেলেস্তেদের সামনে এবার সুইস ঘড়ির নিখুঁত কাঁটার এক নতুন চ্যালেঞ্জ!

প্রথম অঙ্ক: মিশরের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন

প্রথমার্ধের কৃষ্ণপক্ষ ও ‘ওথেলো’র ট্র্যাজেডি

ম্যাচের ঘড়িতে যখন ৭৭ মিনিট, স্কোরবোর্ডে তখন জ্বলজ্বল করছে মিশরের ২-০ ব্যবধানের লিড। গ্যালারিতে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকাগুলো যেন বিষণ্ণতার চাদরে ঢাকা। মাঠের আলবিসেলেস্তেরা তখন শেকসপিয়ারের ‘ওথেলো’র মতোই এক নির্মম নিয়তির শিকার। ওথেলো যেমন ডেসডিমোনার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস আর যন্ত্রণার চোরাবালিতে ডুবে ধুঁকে ধুঁকে মরছিলেন, তেমনি আর্জেন্টিনার ডাগআউট আর বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয় তখন সন্দেহের দোলাচলে বিদ্ধ।

মিশরীয় ফারাওদের রক্ষণের চক্রব্যূহে আটকে গিয়ে তখন বারবার মনে হচ্ছিল, আজকের রাতটি কেবলই এক বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাসের। নীল-সাদা শিবিরের ট্র্যাজেডি তখন প্রায় নিশ্চিত; ট্রাজিক হিরোর মতো তাদের পতন কেবল সময়ের ব্যাপার।

শেষ ১৩ মিনিটের ‘ওডিসি’: এক মহাকাব্যিক যাত্রা

কিন্তু ফুটবল দেবতা বোধহয় স্ক্রিপ্টটা অন্যভাবে লিখেছিলেন। ম্যাচের শেষ ১৩ মিনিট—যা আসলে কোনো সময় ছিল না, তা ছিল এক অনন্তকাল। ঠিক তখনই শুরু হলো এক রূপক ‘ওডিসি’। হোমারের ওডিসিউস যেমন ট্রয় যুদ্ধ শেষে ঘরে ফেরার জন্য সমস্ত বাধা, সাইরেনদের মায়াবী ডাক আর দানবদের আক্রমণ উপেক্ষা করে এক রুদ্ধশ্বাস যাত্রা করেছিলেন, আর্জেন্টিনার ফুটবলাররাও যেন সেই ওডিসিউসের আত্মায় বলীয়ান হলেন।

  • মেসির তুলির শেষ টান: যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, তখনই ক্যানভাসে জাদুকরের প্রবেশ। লিওনেল মেসির পা থেকে বেরোনো একেকটি পাস যেন কোনো কবির নিখুঁত উপমা—প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণকে এক মুহূর্তে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়া একেকটি কাব্যিক চরণ। সেই জাদুকরী পাসের ওপর ভর করে আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফিরল শুধু তা-ই নয়, মেসির নিজের অবিনশ্বর, অসাধারণ নৈপুণ্য মিশরের ডিফেন্ডারদের করে তুলল কেবলই বোবা দর্শক।
  • দ্রোহের আগুন: প্রথম ও দ্বিতীয় গোলটি যখন মিশরের জাল স্পর্শ করল, তখন মনে হলো মৃতপ্রায় শরীরে আচমকা এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল। নির্ধারিত সময় রূপ নিল এক অবিশ্বাস্য সমতায়।

শেষ সময়ের ক্লাইম্যাক্স: মার্টিনেজের সৃষ্টি ও এনজোর শেষ পেরেক

শেকসপিয়ারের নাটক তখন আর ট্র্যাজেডিতে শেষ হওয়ার উপায় নেই, তা মোড় নিয়েছে এক রোমাঞ্চকর ক্লাইম্যাক্সে। ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও তখন রোমাঞ্চের টানটান উত্তেজনা। আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে মঞ্চে এলেন লাউতারো মার্টিনেজ। ডান প্রান্ত থেকে তিনি যখন বলটি বাড়ালেন, তা কেবল কোনো সাধারণ পাস ছিল না; সেটি ছিল জ্যামিতিক মাপে আঁকা এক অনিন্দ্য সুন্দর ও নিখুঁত আলপনা। মিশরের রক্ষণভাগের সমস্ত প্রতিরোধকে ফাঁকি দিয়ে সেই বল গিয়ে পৌঁছাল তরুণ তুর্কি এনজো ফার্নান্দেজের পায়ে।

এনজো তখন যেন এক নির্মম জল্লাদ, অবিশাস্য দক্ষতায় হ্যাড করে মিশরের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকার দায়িত্ব। কোনো ভুল করলেন না তিনি। এক বিদ্যুৎগতির হ্যাডে বলটি যখন মিশরের জালের শেষ প্রান্তে চুমু খেল, তখন যেন ট্র্যাজেডির পুরো মঞ্চটাই এক লহমায় ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। মিশরের বুকভাঙা কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে রচিত হলো নীল-সাদাদের এক অমর বিজয়ের মহাকাব্য।

“মিশর যখন জয়ের মুকুট পরার অপেক্ষায়, আর্জেন্টিনা তখন নিজেদের রক্ত দিয়ে লিখছিল এক প্রত্যাবর্তনের উপাখ্যান। মেসির কাব্যিক ছোঁয়া, মার্টিনেজের নিখুঁত সৃষ্টি আর এনজোর শেষ পেরেকে ট্র্যাজেডি জন্ম নিতে নিতে শেষ মুহূর্তে তা হয়ে উঠল এক অমর বিজয়ের মহাকাব্য।”

খেলা শেষে স্তব্ধ মিশরের ফুটবলাররা মাঠের ঘাসে শুয়ে ভাবছিলেন, আর গ্যালারির বোবা চোখগুলো যেন ফিসফিসিয়ে উঠছিল—“হু! এভাবেও কি ফিরে আসা যায়?”

হ্যাঁ, যায়। যদি পায়ে থাকে মেসির জাদুর ছোঁয়া, মার্টিনেজের নিখুঁত দৃষ্টি আর এনজোর মতো হার না মানার এক আদিম জেদ।

দ্বিতীয় অঙ্ক: সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নতুন রোমাঞ্চের অপেক্ষা

মিশরের সেই রূপকথা এখন অতীত। আলবিসেলেস্তেদের সামনে এখন সম্পূর্ণ নতুন এক দিগন্ত, নতুন এক ধাঁধা। আগামীকালের সকালের সূর্যটা কি নীল-সাদা আবিরে রাঙানো থাকবে, নাকি আল্পস পর্বতের চূড়ার মতো এক শুভ্র, শীতল স্তব্ধতায় ছেয়ে যাবে—তা আগে থেকে বলা যেন কোনো এক রহস্যময় উপন্যাসের শেষ পাতাটি না পড়েই অনুমান করার মতো কঠিন।

যখনই মাঠে নামে মেসি বাহিনী, ফুটবল বিশ্ব তখন আর কোনো গাণিতিক ছকে চলে না। ম্যাচের সবুজ ক্যানভাসে তখন ভর করে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ, এক তীব্র সম্মোহন।

মেসির ছায়াপথ ও ‘ফুটবল মাফিয়া’দের মায়াজাল

মাঠে মেসিদের ফুটবল খেলাটা আসলে এক ধরণের নান্দনিক অপরাধ। রক্ষণভাগের কড়া পাহারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, চোখের পলকে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে যেভাবে তারা ছিন্নভিন্ন করে দেয়—তা যেন ফুটবলীয় সূক্ষ্ম শিল্প আর পেশাদারিত্বের এক অদ্ভুত মিশেল। তারা যখন বল নিয়ে ডি-বক্সের চারপাশে ছোট ছোট পাসের বৃত্ত তৈরি করে, তখন মনে হয় কোনো জাদুকর তার মায়াজাল বিছিয়ে দিচ্ছে, যেখানে প্রতিপক্ষ কেবলই এক মোহগ্রস্ত দর্শক।

লিওনেল মেসির পায়ের ছোঁয়া মানেই তো এক-একটা চলমান কবিতার পঙক্তি। কখনো তিনি মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে এমন এক দূরদর্শী পাস বাড়াবেন যা ডিফেন্ডারদের কল্পনার অতীত, আবার কখনো নিজেই বল পায়ে এঁকেবেঁকে চলে যাবেন গোলের ঠিকানায়। এই কাব্যিক ছন্দের সাথে যখন যুক্ত হয় আলবিসেলেস্তেদের চিরন্তন দ্রোহ আর জেদ, তখন ফুটবল মাঠে এক অন্যরকম রোমাঞ্চের জন্ম হয়।

সুইস ঘড়ির নিখুঁত কাঁটা বনাম লাতিন হৃদয়ের স্পন্দন

তবে মিশরের নাটকের চেয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষের এই লড়াইয়ের রসায়নটা সম্পূর্ণ আলাদা। এটি আসলে দুটি ভিন্ন গোলার্ধের, দুটি ভিন্ন দর্শনের সংঘাত:

সুইজারল্যান্ডের নিখুঁত ব্যূহআর্জেন্টিনার লাতিন উন্মাদনা
একপাশে থাকবে সুইজারল্যান্ডের সেই বিখ্যাত, নিখুঁত সুইস ঘড়ির কাঁটার মতো সুশৃঙ্খল ফুটবল।অন্যপাশে থাকবে আর্জেন্টিনার হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দেওয়া ফুটবল—যেখানে হিসাব-নিকাশের চেয়ে বিশ্বাসের পাল্লাটাই ভারি।
তাদের জমাট রক্ষণ আর হিসেবি আক্রমণ যেকোনো পরাশক্তিকে মুহূর্তের মধ্যে থমকে দিতে পারে।লাতিনদের চিরন্তন দ্রোহ, মাঠের চিরচেনা ছন্দ আর অনবদ্য সৃষ্টিশীলতার আক্রমণভাগ।

সুইসদের সেই সুশৃঙ্খল দুর্ভেদ্য দেয়ালে মেসির জাদুর কাঠি আজ কতটা ফাটল ধরাতে পারবে, নাকি সুইসদের পাল্টা আঘাতে আর্জেন্টিনার ডিফেন্স কেঁপে উঠবে, সেই দোলাচলেই এখন দুলছে কোটি ফুটবলপ্রেমীর মন। মিশরের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা হয়তো আবেগের জয় ছিল, কিন্তু সুইজারল্যান্ডের নিরেট গাণিতিক ফুটবলের সামনে শুধু আবেগ দিয়ে পার পাওয়া যাবে না; সেখানে প্রয়োজন হবে নিখুঁত রণকৌশলের।

ফুটবল ইতিহাসের এমন আরও কিছু রুদ্ধশ্বাস রূপকথার গল্প পড়ুন এখানে

কালকের সকালে কোন আলপনা আঁকা হবে?

ম্যাচের শেষ বাঁশি যখন বাজবে, তখন ভোরের আলো ফুটবে। কিন্তু সেই ভোরের আলো কোন রঙের আলপনা নিয়ে আসবে?

হয়তো কালকের সকালটি জাগবে মেসির কোনো অবিশ্বাস্য জাদুকরী রূপকথার গল্প নিয়ে, যেখানে নীল-সাদা ভক্তরা মেতে উঠবে বাঁধভাঙা উল্লাসে। আর নয়তো, ফুটবল তার স্বভাবসুলভ নিষ্ঠুরতায় উপহার দেবে আল্পস পর্বতের মতো এক স্তব্ধ ভোরের ট্র্যাজেডি।

ফুটবল স্ক্রিপ্টরাইটাররা আজ কোন গল্পটা লিখছেন, তা অনুমান করা সত্যিই অসম্ভব। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—মিশরের বিপক্ষে যেভাবে ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছিল আর্জেন্টিনা, সুইসদের বিপক্ষেও তেমন কোনো মহাকাব্যের আশাতেই বুক বাঁধছে ফুটবল বিশ্ব। মাঠের সবুজ ঘাসে যে রোমাঞ্চের আলপনা আঁকা হতে যাচ্ছে, তা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে এক অমর গাথা হয়ে বেঁচে থাকবে অনেক দিন। অপেক্ষা এখন শুধু সেই মহাকাব্যিক নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের পর্দা ওঠার!

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)