ফুটবলের সৌন্দর্য ও বিতর্ক যেন একই সুতোয় বাঁধা। ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বা সুন্দর খেলা। বিশ্বজুড়ে এই খেলার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এর সহজাত সরলতা, গতি এবং এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাস্য নান্দনিকতায়। কিন্তু যেখানে চরম উত্তেজনা আর আবেগের মহাসমুদ্র থাকে, সেখানে বিতর্কও হাত ধরাধরি করে চলে। ফুটবলের ইতিহাস যেমন চোখধাঁধানো সৌন্দর্যে ভাস্বর, তেমনি তা নানা অমীমাংসিত বিতর্কেও জর্জরিত। আলো আর ছায়ার এই চিরন্তন দ্বৈরথই ফুটবলকে করেছে জীবন্ত। তাই ফুটবলের সৌন্দর্য ও বিতর্ক কে আলাদা করে ভাবার কোন অবকাশ নেই।
আমি কোনো ফুটবল বিশেষজ্ঞ নই, কিংবা ফুটবল ব্যাকরণ নিয়ে খুব গভীর সুজ্ঞান আছে—এমন দাবি করাটাও হবে ধৃষ্টতা। তবে নিজেকে একজন খাঁটি ফুটবলপ্রেমী বলতে দ্বিধা নেই। ফুটবলকে ভালোবাসি, এর সবুজ মাঠের ছন্দকে উপভোগ করি। শৈশবে গ্রামের ধুলোবালি মাখা মাঠে খুব ভালো খেলোয়াড় না হতে পারলেও, আনন্দের জন্য, বিকেলটাকে রাঙানোর জন্য বুঁদ হয়ে থাকতাম এই খেলায়। সেই নাড়ির টান থেকেই হয়তো ফুটবল নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা, সুযোগ পেলে নিজের মতামত প্রকাশ করা।
একজন প্রকৃত ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমি যেমন জয়ের উন্মাদনাকে উপভোগ করি, তেমনি পরাজয়ের ট্র্যাজেডিকেও মেনে নিই অবলীলায়। কারণ, পরাজয় না থাকলে জয়ের কোনো মহিমা থাকে না। একজনকে বিজয়ী হতে হলে অন্যজনকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ নিতেই হবে—এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। সমর্থক হিসেবে এই দুটি সত্যকে যিনি সমভাবে আলিঙ্গন করতে পারেন, তিনিই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য আস্বাদন করতে পারেন।
আমাদের হারিয়ে যাওয়া ফুটবল ও ‘মৌসুমী পণ্ডিতদের’ আস্ফালন
ফিরে তাকাই আমাদের শৈশবে। গ্রামীণ জনপদে, পাড়ায় পাড়ায় তখন ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো, আজ এই যান্ত্রিক সময়ে এসে তার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। মাঠগুলো আজ শূন্য, ছেলেমেয়েরা এখন ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেট বা ভার্চুয়াল গেমে বেশি মজে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষই এখন ‘মৌসুমী ফুটবল প্রেমিক’। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ এলে কিংবা বড় কোনো টুর্নার্মেন্ট চললে আমাদের ঘুম ভাঙে।
কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই মৌসুমী ফুটবল ভক্তরাই টুর্নামেন্ট চলাকালীন একেকজন পরম ফুটবল পণ্ডিত বনে যান! চায়ের দোকান থেকে ফেসবুকের দেয়াল—সবখানেই এমনভাবে তাত্ত্বিক আলোচনা আর তর্ক চলে, যেন তাদের চেয়ে ফুটবল আর কেউ ভালো বোঝে না। ফুটবলের অফিশিয়াল নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে, সবাই নিজের মতো করে মনগড়া ব্যাখ্যা ও অদ্ভুত যুক্তি দাঁড় করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর এই অজ্ঞতাপ্রসূত জেদই বিতর্ককে উসকে দেয়, যা কখনো কখনো রূপ নেয় কুৎসিত হাতাহাতিতে।
বাঙালি হিসেবে আমাদের আবেগ যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি আমাদের সমর্থনের ধরনও অনেক সময় উগ্র রূপ নেয়। ‘আমার দলকেই জিততে হবে’—এই গোঁড়ামি আমাদের অন্ধ করে দেয়। তখন আমরা রেফারিকে কাঠগড়ায় তুলি, ফিফার মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সততা নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন তুলি। এমনকি এমন উদ্ভট ও আজব গুজবও রটে যায় যে, বাংলাদেশ থেকে নাকি হাজার হাজার কোটি টাকা ফিফাকে পাঠানো হয়েছে কোনো বিশেষ দলকে জেতাতে! এই ধরনের হাস্যকর ও তথ্যহীন অপপ্রচার কেবল আমাদের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে না, বরং ফুটবলের চিরন্তন মাহাত্ম্যকেও ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
আমাদের মনে রাখা উচিত, রেফারিও রক্ত-মাংসের মানুষ। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তাঁরও ভুল হতে পারে, এবং সেটাই স্বাভাবিক। গঠনমূলক সমালোচনা করা যেতেই পারে, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই ফুটবলের আত্মাকে কলঙ্কিত না করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ট্রলিংয়ের কদর্যতা
বর্তমান যুগে আরেকটি বিষয় ভীষণ পীড়াদায়ক, তা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং এক দলের সমর্থকদের দ্বারা অন্য দলের সমর্থকদের কুরুচিপূর্ণ ট্রল করা। সুস্থ রসিকতা বা মার্জিত খুনসুটি খেলারই অংশ হতে পারে; কিন্তু বর্তমানে ট্রলিংয়ের নামে যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ শব্দ, অঙ্গভঙ্গি ও কন্টেন্ট তৈরি করা হচ্ছে, তা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। এই অসুস্থ চর্চা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক বিষাক্ত প্রভাব ফেলছে। তারা শৈশব থেকেই পরমতসহিষ্ণুতা ভুলে হিংসা আর বিদ্বেষ শিখছে। যার ফলে খেলাকে কেন্দ্র করে পাড়ায়-মহল্লায় মারামারি, এমনকি রক্তপাতের মতো ঘটনাও ঘটছে। যে খেলা আবিষ্কার হয়েছিল মানুষের মানসিক প্রশান্তি, বিনোদন ও সৌহার্দ্যের জন্য, তা যদি হিংসা আর সম্পর্ক বিনষ্টের কারণ হয়—তবে তার চেয়ে বড় পরাজয় আর কিছু হতে পারে না।
ফটবলের দ্বিমুখী রূপ: ফুটবলের সৌন্দর্য ও বিতর্ক
সম্প্রতি আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের মধ্যকার ম্যাচটিকে কেন্দ্র করেও ফুটবল বিশ্বে নানাবিধ তর্ক-বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে ফুটবলের ভেতরের আলো ও অন্ধকারকে বিশ্লেষণ করলে দুটি রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ফুটবলের নান্দনিক সৌন্দর্য
ফুটবলের আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর গতি, ছন্দ এবং রোমাঞ্চকর অনিশ্চয়তার মধ্যে। মাঠের ১১ জন খেলোয়াড় যখন এক সুতোয় গেঁথে নিখুঁত বোঝাপড়ায় পাসিং গেম খেলেন, তখন মনে হয় যেন সবুজ ক্যানভাসে কোনো শিল্পী তুলির আঁচড়ে ছবি আঁকছেন।
- পায়ের জাদু ও ড্রিবলিং: পেলের সেই বিখ্যাত বাইসাইকেল কিক, ম্যারাডোনার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শতাব্দীসেরা একক ড্রাইভ, কিংবা লিওনেল মেসির শরীরের জাদুকরী মোচড়ে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করার দৃশ্য মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা নান্দনিক শিল্প।
- ঐক্য ও সম্প্রীতি: ফুটবল বর্ণ, ধর্ম, ভাষা ও জাতীয়তার দেয়াল ভেঙে মানুষকে এক গ্যালারিতে এনে দাঁড় করায়। সেখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষ কাঁদে, হাসে এবং ভালোবাসার জয়গান গায়।
- অনিশ্চয়তার রোমাঞ্চ: ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। আন্ডারডগ বা দুর্বল কোনো দলের পরাশক্তিকে হারিয়ে রূপকথা লেখার জাদু কেবল এই ফুটবল মাঠেই সম্ভব।
বিতর্কের কালো ছায়া
যেখানে তীব্র আলো থাকে, সেখানে কিছুটা অন্ধকার তো থাকবেই। মাঠের ভেতরের ও বাইরের কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা প্রায়শই ফুটবলের এই সুন্দর অবয়বকে ম্লান করে দেয়।
- রেফারির ভুল ও ভিএআর (VAR): একসময় রেফারির একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিত, যার বড় উদাহরণ ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। আধুনিক যুগে বিতর্ক কমাতে VAR (Video Assistant Referee) আনা হলেও, এর মিলিমিটারের অফসাইড হিসাব এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দীর্ঘসূত্রতা বিতর্ককে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
- আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচ বিতর্ক: মাঠের এই প্রযুক্তিগত বিতর্কের সাম্প্রতিক ও অন্যতম বড় উদাহরণ আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের মধ্যকার ম্যাচটি। ম্যাচটি ফুটবলীয় নান্দনিকতার চেয়েও বেশি জন্ম দিয়েছে নাটকীয়তা আর অমীমাংসিত কিছু প্রশ্নের। ডি-বক্সের ভেতরে একটি ফাউল বা হ্যান্ডবলকে কেন্দ্র করে রেফারির পেনাল্টির সিদ্ধান্ত এবং যোগ করা অতিরিক্ত সময় (Injury Time)-এর দীর্ঘতা নিয়ে মিশরের রক্ষণভাগ ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, ম্যাচ শেষে মাঠের ভেতর খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফদের মধ্যকার ধাক্কাধাক্কি ও রেফারির ওপর চড়াও হওয়ার মানসিকতা ফুটবলের খেলোয়াড়সুলভ চেতনাকে (Sportsmanship) ক্ষুণ্ণ করেছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, মাঠের এই বিতর্ক যখন আমাদের দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসে পৌঁছায়, তখন তা রূপ নেয় এক কুরুচিপূর্ণ কাদা-ছোড়াছুড়ির যুদ্ধে। একপক্ষ মিশরের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে আর্জেন্টিনাকে ‘ফিফার সুবিধাভোগী চোর’ বা রেফারি কিনে নেওয়ার মতো মনগড়া ট্রলে মেতে উঠেছে, তো অন্যপক্ষ জয়ের অন্ধ আনন্দে প্রতিপক্ষের ফুটবল শৈলীকে বিশ্রীভাবে হেয় করছে। উভয় পক্ষই ফুটবলের মূল নিয়মকানুন না জেনে, শুধু অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে সমাজ ও মানসিকতায় বিষ ছড়াচ্ছে।
- মাঠের ভেতরের আগ্রাসন ও ডাইভিং: ফাউল না হওয়া সত্ত্বেও পেনাল্টি পাওয়ার জন্য খেলোয়াড়দের মাঠে অভিনয়ের আশ্রয় নেওয়া বা ‘ডাইভিং’ ফুটবলের মূল চেতনাকে আঘাত করে।
- ফুটবলীয় রাজনীতি ও দুর্নীতি: মাঠের বাইরে ফিফা (FIFA) বা বিভিন্ন ফুটবল Boards-এর ভেতরের আর্থিক দুর্নীতি, ম্যাচ ফিক্সিং এবং বিভিন্ন বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের নেপথ্যের নোংরা রাজনীতি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
বর্ণবাদ: আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় অভিশাপ হলো গ্যালারি থেকে খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া বর্ণবাদী মন্তব্য। রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ অনেক কৃষ্ণাঙ্গ তারকাকে প্রতিনিয়ত এই মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
ফুটবলের সৌন্দর্য যদি এর আত্মা হয়, তবে বিতর্ক যেন তার নাটকীয়তার রসদ। তাই ফুটবলের সৌন্দর্য ও বিতর্ক যেন আজীবন পাশাপাশি চলে আসছে। বিতর্কহীন নিস্তরঙ্গ ফুটবল হয়তো তার এই চরম উত্তেজনা ও আকর্ষক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলত। তবে সেই বিতর্ক হওয়া উচিত সুস্থ, মার্জিত ও যুক্তিগ্রাহ্য।
শত বিতর্ক, সমালোচনা আর ভুলের পরেও ফুটবলপ্রেমীরা প্রতি উইকএন্ডে টিভির সামনে বসেন, প্রিয় দলের জার্সিতে গ্যালারি কাঁপান। কারণ দিনশেষে, সব বিতর্ক ও পঙ্কিলতা ছাপিয়ে ফুটবলের বিশুদ্ধ সৌন্দর্যই মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। মাঠের সবুজ ঘাসে যখন বলটি গড়ায়, তখন সব দ্বেষ ভুলে মানুষ বুঁদ হয়ে রয় এক আদিম জাদুতে। আর তাই তো ফুটবল আজও, এবং চিরকাল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা।

