গাজী মাজহারুল আনোয়ার বাংলার কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক । গতকাল ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ রোববার সকাল ৭টায় রাজধানীর বারিধারায় নিজ বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন । পরে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার জীবনী: গাজী মাজহারুল আনোয়ার ১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার তালেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০ হাজার গানের রচয়িতা গাজী মাজহারুল আনোয়ার ১৯৬৪ সালে ২১ বছর বয়সে রেডিও পাকিস্তানে গান লেখা শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই নিয়মিত গান ও নাটক রচনা করেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ার প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখেন ১৯৬৭ সালে আয়না ও অবশিষ্ট চলচ্চিত্রের জন্য। ১৯৬৭ সালে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গান লেখাতেও দক্ষতা দেখান তিনি। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নান্টু ঘটক’ মুক্তি পায় ১৯৮২ সালে। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ৪১ টি। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম- ‘শাস্তি’, ‘চোর’, ‘শর্ত’, ‘স্বাধীন’, ‘সমর’, ‘রাগী’, ‘আর্তনাদ’, ‘জীবনের গল্প’, ‘পাষানের প্রেম’, ‘তপস্যা’, ‘ক্ষুধা’, ‘পরাধীন’, ‘এই যে দুনিয়া’, ‘হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ’।
স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম নিয়ে তিনি অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান লিখেছেন। আনোয়ার ২০০২ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি স্বাধীন দেশের সর্বপ্রথম পুরস্কার বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিকবার বাচসাস পুরস্কার, বিজেএমই অ্যাওয়ার্ড, ডেইলি স্টার কর্তৃক লাইফ টাইম অ্যাওয়ার্ডসহ তার অর্জিত পুরস্কারের সংখ্যা ১১০। বিবিসি বাংলা তৈরিকৃত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের তালিকায় রয়েছে তার লেখা তিনটি গান।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠন (জাসাস) এর সাবেক সভাপতি এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ছিলেন।
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জনপ্রিয় যত গান

তিনি গান লিখেছেন ২০ হাজারের বেশি; সর্বকালের সেরা বাংলা গান নির্বাচনে বিবিসির জরিপে শীর্ষ ২০ গানের তিনটিই তার। এই তিনি গাজী মাজহারুল আনোয়ার। একাধারে তিনি ছিলেন গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক।
বাংলা আধুনিক গানের পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা গাজী মাজহারুল আনোয়ার রোববার চিরবিদায় নিলেন; রেখে গেলেন অসংখ্য গান, যেগুলো এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
জয় বাংলা বাংলার জয়
সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চনা-দুর্দশা আর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষাকে ছন্দময় গীতে প্রকাশ হয় এই গানে। গানটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে । অমর এই গানটিতে সুর দিয়েছেন আনোয়ার পারভেজ। গেয়েছেন শাহনাজ বেগম ও আব্বুল জব্বার। ‘জয় বাংলা’ চলচ্চিত্রের জন্য গানটি লেখা হলেও মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির সাহস ও স্বপ্নের প্রতীক হয়ে ওঠে গানটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের সঙ্গেও গানটি জড়িয়ে আছে। বিবিসির জরিপে সেরা ২০ গানের মধ্যে এই গানটির অবস্থান ছিল ত্রয়োদশ।
একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল
দেশ প্রেম নিয়ে মন মাতানো এই গানটি গাজী মাজহারুল আনোয়ার-আনোয়ার পারভেজ-শাহনাজ রহমতুল্লাহ ত্রয়ীর আরেক সৃষ্টি ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল।’ বিবিসির সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় গানটি উনবিংশ স্থানে উঠে আসে। সত্যিই এই গানটিও একটি অসাধারণ সৃষ্টি।
আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার
গোলাপী এখন ট্রেনে’ চলচিত্রের আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার গানটিু ব্যাপক জনপ্রিয় একটি গান। এই চলচ্চিত্রটি ১৯৭৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত লাভ করে। আলাউদ্দিন আলীর সুরে গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। ছবিটি মুক্তির পর দ্রুত গানটি দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনারগাঁয়
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গানের ভান্ডারে এই দেশাত্মবোধক গানটি এক অসাধারণ সৃষ্টি। যতবারই শোনি ততবারই শোনতে ইচ্ছে করে তবুও যেন মন ভরেনা।এই গানেরও সুর করেছেন আনোয়ার পারভেজ। গেয়েছেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। বিবিসির সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় ‘একবার যেতে দে না’ গানের অবস্থান ছিল পঞ্চদশ।
আকাশের হাতে আছে এক রাশ নীল
‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’ চিরসবুজ গান হিসেবে এখনও শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় গানটি। গানটি ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ সিনেমার। গানটিতে সুর করেছিলেন সত্য সাহা। শিল্পী ছিলেন বশীর আহমেদ ও আনজুমান আরা বেগম। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া আয়না ও অবশিষ্ট সিনেমায় অভিনয় করেন আজিম, সুজাতা, সুচন্দা। দারুন জনপ্রিয় এই গানটি এখনো কোথাও বাজলে থমকে যেতে হয়।
ইশারায় শিস দিয়ে আমাকে ডেকো না
ওহো কি অপরুপ গান ও সুর। গানটি শোনলে হ্রদয় মন ছুঁয়ে যায়।‘বন্দিনী’ সিনেমায় ছিল এই গান। সুর করেছিলেন পারভেজ আনোয়ার। কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। আলাউদ্দিন আলীর সংগীতায়োজনে গানটি এখনও সব শ্রেণির শ্রোতার কাছে জনপ্রিয়। এই গানে ববিতার সঙ্গে পর্দায় দেখা যায় ওয়াহিদ কাদেরকে। তিনি ছিলেন তৎকালীন আফগান রাষ্ট্রদূতের ছেলে।
নীল আকাশের নিচে
তার আরেকটি জনপ্রিয় গান ‘নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা’। ‘নীল আকাশের নিচে’ সিনেমায় গানটি গেয়েছেন খন্দকার ফারুক আহমেদ। গানটির সুর করেছেন সত্য সাহা। এই গানটির সাথে ঠোঁট মিলিয়েছেন নায়ক রাজ রাজ্জাক । একসময় সবার মুখে মুখে ছিল এই গানটি।
এই মন তোমাকে দিলাম
তরুণ শিল্পী মাহতাম সাকিব তুমুল জনপ্রিয় হয়েছেন এই গান গেয়ে। গানটি প্রথম ব্যবহার হয় ‘মানসী’ সিনেমা। গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন। সুর করেছিলেন আনোয়ার পারভেজ। মানসী পরিচালনা করেন অভিনেতা ও পরিচালক ফখরুল হাসান বৈরাগী।
চোখ যে মনের কথা বলে
৭০ দশকের সিমেনা ‘যে আগুনে পুড়ি’ সিনেমায় রাজ্জাক-সুচন্দাকে পর্দায় দেখা যায় এই গানের সঙ্গে। গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন খন্দকার নুরুল আলম, সুরও দিয়েছিলেন তিনি। এরপর ‘আজ গায়ে হলুদ’ সিনেমায়ও গানটি ব্যবহার করা হয়। মৌসুমী, আমিন খান ও মাহফুজকে গানের সঙ্গে পর্দায় দেখা যায়। গান গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর। এই সিনেমার জন্য গানটিতে নতুন করে সুর দেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।
গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে
এ গানের সিনেমাটিও ৭০ দশকের। স্বরলিপি সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। সিমেনাটিতে অভিনয় করেন নায়করাজ রাজ্জাক। এ গানের মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় প্রথম কণ্ঠ দেন রুনা লায়লা। রুনা লায়লা তখন লাহোরে বসবাস করতেন। লাহোর গিয়ে গানের রেকর্ড করা হয়। সুবল দাসের সুরে গানে কণ্ঠ দেন রুনা লায়লা ও মাহমুদুন নবী। চমৎকার এ গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ।
এছাড়াও গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘চক্ষের নজর এমনি কইরা’, ‘কারো আপন হইতে পারলি না অন্তর’, ‘হয় যদি বদমান হোক আরো’, সবাই বলে বয়স বাড়ে আমি বলি কমে, যদি আমাকে জানতে সাধ হয়, অনেক সাধের ময়না আমার বাধন কেঁটে যায়, তুমি কখন এসে দাঁড়িয়ে আছো আমার অজান্তে, গীতিময় সেইদিন চিরদিন, আমি তো বন্ধু মাতাল নই, সবাই তো ভালবাসা চায়, সবার জীবনে প্রেম আসে, ‘দুনিয়াটা মস্ত বড়’সহ এরকম অসংখ্য গান।গাজী মাজহারুল আনোয়ার

