কবিতার নেপথ্যে চাঁদ ও জোছনা কাব্য-

জোছনা ও স্মৃতির জলছবি

আজ হয়তো পূর্ণিমা, নয়তো নয়। শহরের ব্যস্ত মানুষগুলোর সে খেয়াল রাখার ফুরসত কোথায়? আমিও তার ব্যতিক্রম হতে পারিনি। শহর জীবনের এই কৃত্রিম নিয়ন আলোর আধিপত্যে স্নিগ্ধ জোছনার মহিমালোক যেন সবার অলক্ষ্যে, অযত্নে আর অবহেলাতেই ম্লান হয়ে পড়ে। তবুও এই জোছনা-বিলাসী মন চিরকালই জোছনালোকের প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেতে ব্যাকুল। সেই ব্যাকুলতার সাড়া দিতে গিয়েই নিজেকে আবিষ্কার করলাম বারান্দায়।

হঠাৎ মনে হলো—আজ কি তবে প্রবারণা পূর্ণিমা?

হ্যাঁ, ওই তো আকাশে সেই নিরুপম, সৌন্দর্যময় ও মায়াবী চাঁদ। বিমুগ্ধ জোছনায় স্বপ্নীল চারপাশ। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। একা দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়; দখিনা হাওয়ার আলতো ছোঁয়ায় যেন এক প্রশান্তির স্রোতধারা বয়ে গেল ক্লান্ত এ দেহে। জোছনার কিরণে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে শুভ্র শিশির কণা। আমি অবচেতন মনেই ভেসে গেলাম সেই সব দিনের স্মৃতির ভেলায়। কবিতা, চাঁদ আর জোছনা যেন একই সূত্রে গাঁথা হয়ে গেল দিন থেকে দিনান্তে, আর অন্ত থেকে অনন্তে ।

আর হ্যাঁ, সেই জোছনার আলোয় সিক্ত হয়ে রাত জেগে কবিতা লেখার বালখিল্য রোমাঞ্চকর স্মৃতির ভেলায় সঙ্গী করতে চাই আপনাদের।


দেরিতে পৌঁছানোর মাসুল

পরের দিন একটি অনুষ্ঠান, সেটি নিয়েই আমাদের আড্ডার মূল আলোচনা। আমার পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল। যাওয়ার পথে ভাবছি, আজ নির্ঘাত সবার হাতে তুলোধুনো হতে হবে। মনে মনে বাঁচার একটা ফন্দি আঁটলাম। গিয়ে দেখি সেখানে কবিতা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। কবিতার বিষয়ে আমি বরাবরই অনাগ্রহী, তাই বন্ধুরা আমাকে ‘বেরসিক’ ও ‘আনরোমান্টিক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

আমি পৌঁছেই খানিকটা মেকি বিরক্তি নিয়ে বললাম, “কবিতা-টবিতা বাদ দে তো! তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ে আছে।” লেড্ডুয়া বলে উঠল, “এই বোবাজি! তুই দেরি করে আসলি, আবার এসেই গ্যাঞ্জাম শুরু করলি?” আমি বললাম, “যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা নিয়েই তো আগে কথা হওয়া উচিত, তাই না?” তখন আমাদের ‘নাম বিশারদ’ উচ্চস্বরে ঘোষণা করল, “তুই থাম! কালকের অনুষ্ঠানের জন্য তুই একটি কবিতা লিখে আনবি। দেরি করার এটাই তোর শাস্তি।” শত ক্ষমা চেয়েও পার পেলাম না; অগত্যা নিরুপায় হয়ে শাস্তিটা মাথা পেতে নিতে হলো।

নাম মাহাত্ম্য

এই ফাঁকে একটা গোপন কথা বলে রাখি। আমাদের মধ্যে একজন ছিল ‘নাম বিশারদ’। সে আমাদের প্রায় সকলকেই অদ্ভুত সব নামে নামাঙ্কিত করেছিল। যেমন মমিন সবসময় দেরি (লেট) করে আসত বলে তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘লেড্ডুয়া’। আমি বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকতাম, কেউ ডাকলে আমার প্রথম উত্তরটি হতো জি । তাই এই দুইয়ে মিলে আমাকে নাম দেয়া হয়েছে ‘বোবাজি’। প্রতিবাদ করেও লাভ হয়নি। অবশ্য পেশাগত জীবনেও এই অপবাদ থেকে মুক্তি পাইনি; লোকে বলে আমি নাকি ‘ইন্ট্রোভার্ট’! যাই হোক, নাম মাহাত্ম্য নিয়ে অন্য একদিন বিস্তারিত বলব।

কবিতা লেখার বালখিল্য

আলোচনা সভা শেষে সন্ধায় বাসায় ফিরছি আর ভাবছি। কবিতা যদি লিখতে না পারি তাহলে আগামী কালকে গর্ডান যাবে। আর সে কবিতা লিখতে গিয়েই চাঁদ ও জোছনার সাথে নতুন করে পরিচয়। মনে হলো এত আপন করে কখনো পাইনি তারে। মধ্যরাত পেরিয়ে নিবিড় রজনীতে নিবিস্ত হচে্ছ বিমুগ্ধ চাঁদ, অষ্টাদর্শীর যৌবনা রুপে সেজেছে চাঁদটা কোন বঙ্গ ললনাতে, প্রকৃতির জোছনালোকিত স্বপ্নীল মোহাচ্ছন্ন পরিবেশ, চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম গুঞ্জনে ফুল ফোটা মধুর শব্দে পদচল, দখিনা শির শির মৃদু হাওয়ার তোড়ে জোনাকিদের ছোটাছুটি আর আলোর বিচ্ছুরণ। শুধু বিমোহিত হৃদয়ে তার অপূর্ব রুপ রস রং আস্বাদন করেছি। একাগ্রচিত্তে নি:শব্দে নিরবে হাজারো কথা বলেছি। অস্পস্ট স্বরে শুধু বললাম ”এমন মোহিনী রাতে মন চায় প্রেয়সীরে, হৃদয় নিংড়ে তারে আরও ভালবাসি”। হঠাৎ ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে দেখি রাত পোহাতে মোটে ঘণ্টা তিনেক বাকি। চারদিকে তখনো নিঝুম স্তব্ধতা, শুধু আমার টেবিলে পড়ে আছে সদ্য লেখা একটি কবিতা—যা আমার কাছে কেবল শব্দগুচ্ছ নয়, বরং এক রাতের দীর্ঘ সংগ্রাম আর চাঁদ-জোছনার সাথে কাটানো নিবিড় মুহূর্তের নির্যাস। এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে যখন বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম, তখন মনে হলো—শাস্তিটা আসলে আশীর্বাদ হয়েই এসেছিল।

আনন্দ ও “শাস্তির” কিস্তি

পরদিন অনুষ্ঠান শুরুর ঘণ্টাখানেক আগেই আমি গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। আমার হাতে লেখা কবিতাটি দেখে বন্ধুদের বিস্ময়ের সীমা রইল না; সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল! কবিতাটি নিয়ে বেশ হইহুল্লোড় হলো, আমাকে নিয়ে চলল আনন্দ আর নাচানাচি। এরপর লিজার জাদুকরী কণ্ঠে যখন কবিতাটি আবৃত্তি করা হলো, তখন চারদিকের পরিবেশে এক অন্যরকম মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। অনুষ্ঠানও যথাসময়ে সফলভাবে শেষ হলো। সবার প্রশংসার জোয়ারে আমি যেন এক অজানালোকের ভেলায় ভাসছিলাম; এক অদ্ভুত ভালো লাগার শিহরণ বারবার আমায় তৃপ্ত করছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই বাদ সাধল ‘পেটুক্কিয়া’ (নাম বিশারদের দেওয়া সেই মোক্ষম নাম যার অর্থ ”পেটুক তুই খা”)। সে ফোড়ন কাটল— “বন্ধু, এত সুন্দর কবিতা তুই লিখলি কীভাবে? তুই তো কোনোদিন কবিতার ধারেকাছেও ছিলি না! নিশ্চয়ই তুই প্রেমে পড়েছিস, নয়তো ছ্যাঁকা খেয়েছিস।” সাথে সাথে সকলে একসাথে বলে উঠলো “ হে হে তুই নিশ্চয়ই তুই প্রেমে পড়েছিস, নয়তো ছ্যাঁকা খেয়েছিস”। না হলে এতো সুন্দর কবিতা লিখলি কি করে! মনে মনে ভাবলাম, “এই রে! ফেঁসে গেছি তো! এবার নির্ঘাত বিপদ!” সেখান থেকে পালাবার অনেক পথ খুঁজলাম, কিন্তু বন্ধুদের সেই নাছোড়বান্দা স্বভাবের কাছে আমার কোনো ফন্দিই কাজে এল না। এই ফাঁকে আর একটি গোপন কথা বলে রাখি—আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কাউকে জরিমানা বা ‘ট্রিট’ দেওয়ার জালে আটকাতে চাইলে আমরা একটি চিরন্তন ফন্দি কাজে লাগাতাম। আমাদের সেই মোক্ষম অস্ত্রটি ছিল: ‘নিশ্চয়ই তুই প্রেমে পড়েছিস, নয়তো ছ্যাঁকা খেয়েছিস!’ এই অমোঘ ফাঁদে ফেলে আমরা একে অপরের পকেট সাবাড় করতে পটু ছিলাম।

সবাই মিলে একরকম জোর করেই আমাকে ‘প্রেমিক’ সাব্যস্ত করে ছাড়ল। আর সেই কাল্পনিক প্রেমের আনন্দ উদযাপনে আমার ‘সুস্থ-সবল’ পকেটটাকে তারা এমনভাবে নিংড়ে নিল যে, সেটি শেষমেশ অপুষ্টিতে আক্রান্ত রুগ্ন শিশুর মতো বেহাল হয়ে পড়ল। সেই ধাক্কা সামলাতে বেশ কদিন সময় লেগেছিল বটে, কিন্তু আজও মনের অলিন্দে ভাস্বর হয়ে আছে সেই কবিতা, চাঁদ আর মায়াবী জোছনা। সেই সময়টা এখনো আমায় শিহরিত করে, ভীষণ নস্টালজিক করে তোলে। তাই তো ফিরে পেতে ইচ্ছে করে সেই দিনগুলো।

ধন্যবাদ হে প্রিয় চাঁদ, ধন্যবাদ সেই মায়াবী জোছনা!, ধন্যবাদ ‍প্রিয় বন্ধু তোমাদের!

FaucetCrypto
FreeTron. Passive income opportunity.

You May Also Like

One thought on “কবিতার নেপথ্যে চাঁদ ও জোছনা কাব্য-”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)