প্রিয়তমা (priyotoma) নিয়ে তোলপাড়

প্রিয়তমা। না আমার কোন সাবেক বা বর্তমান প্রিয়তমা ’র কথা বলছিনা। এবারের ঈদুল আযহার মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা প্রিয়তমা নিয়েই কথা বলছি আপনাদের সাথে। আজকে হিমেল আশরাফ পরিচালিত প্রিয়তমা সিনেমাটি নিয়ে চলুন একটু রিভিউ করার চেষ্টা করি। আশা করি শেষ পর্যন্ত থাকবেন আমার সাথে। সিনেমাটির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাকিব খান এবং অপার বাংলার ইধিকা পাল। এ ছাড়াও  এ ছবিতে অভিনয় করেছেন লুৎফর রহমান জর্জ, শহীদুজ্জামান সেলিম, এলিনা শাম্মী, শিবা শানু, ডন, ইমতু রাতিশসহ অনেকে। ছবির গল্প লিখেছেন ফারুক হোসেন ও প্রযোজনা করেছেন ভার্সেটাইল মিডিয়া লিমিটেড;

ইতিমধ্যেই প্রিয়তমা সিনেমা, সিনেমার গান ও পোস্টারের লুক দেখে দর্শকদের মধ্যে বেশ আলোচনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে। এই সিনেমাটি অবশ্য আগে থেকেই আলোচনার মধ্যেই ছিল বহু কারণে। এই ছবিটির নির্মাণের ঘোষনা এসেছিলো প্রায় ছয় বছর আগে কিন্তু বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে গত কয়েকমাসের মধ্যে এই সিমেনাটি নির্মাণ করা হয়েছে। তাই এই সিনেমাটি অনেকের কাছে অনেক আকাঙ্ক্ষিত একটা সিনেমা বটে। প্রিয়তমা সিনেমার নামটা শোনে অনেকেই হয়তো আমার মত ভেবেছিলেন যে এটা একটা খাটি রোমান্টিক সিনেমা হবে। তবে সেটা কি ধরনের ছবি চলুন একে একে গল্প ও আড্ডায় জানা যাক।.

শাকিব খান তার অনবদ্য এবং অবিস্মরনীয় অভিনয় দক্ষতা দেখালেন এই প্রিয়তমা ছবিতে। অভিনয়ের ভিন্নতাও লক্ষ্য করা গেছে, লুক-গেটআপে পরিবর্তন এসেছে। কাঁধ বেয়ে পিঠ পর্যন্ত চুলে আপনারা কি কখনো শাকিবকে দেখেছেন? শোনা যায় তাও আবার ন্যাচারালি গ্রো করা! বেচারা অভিনয়ের জীবনদশায় তার উল্টাপাল্টা মেকআপ-গেটআপের জন্য ট্রল হয়েছেন। সেই শাকিব খানকে এবার একটা নিখুঁত প্রস্থেটিক মেকআপে দেখা গেল। বুড়ো বয়সের শাকিব দেখতে কেমন হবে, এই লুকও তো দেখা মিলল এই ছবিতে। এমন শাকিব খানকে কি কখনো দেখেছেন?

প্রিয়তমা

এই ছবিতে একটা বিষয় অনুমান করা যায় যে শাকিব খান আগে একইসঙ্গে তিন-চার সিনেমায় কাজ করতেন। সেজন্য তার অভিনয় মোটামোটি একটা ছবির সাথে আরেকটা ছবির কিছুটা হলেও সাদৃশ্য পাওয়া যেত। তার উপর তিনি তার লুক কন্টিনিউ করতে পারতেন না। তাই অনেক সমালোচক তার অভিনয়ের কোন ভিন্নতা নেই বা একই ধাঁচের অভিনয় বলে সমালোচনা করতেন। কিন্তু প্রিয়তমা ছবিতে সেই সমালোচনার সমুচিত জবাব দিয়েছেন কিং খান ।

তাছাড়া জানা গেছে যে ‘প্রিয়তমা. য় তিনি কোরবানির আগ পর্যন্ত প্রচুর সময় বা টাইম-ডেট দিয়েছিলেন। ফলে এই ছবিতে বেশ গুরুত্বসহকারে মনোযোগ দিয়ে করতে পেরেছেন। নিজেকে চরিত্র অনুসারে গড়ে তোলতে, ওভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। এটা অবশ্য এই মুহূর্তে তার হাতে ছবির সংখ্যা কম থাকার কারনেও হতে পারে অথবা তিনি আগে থেকে বেশী ছবির প্রতি যত্নবান হয়েছেন বলেও হতে পারে। তার সুবিশাল জনপ্রিয়তা, স্বাভাবিকভাবেই সিনেমা চলে যায় আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।

আমার মতে এই ছবিতে একটা দুর্বলতার জায়গাটি হলো পরিচালক শাকিব খানের সুবিশাল ফ্যানবেজকে সিনেমা হলে সন্তুষ্ট করতে, গল্পের ভেতর ম্যাজিক মোমেন্ট রাখার, হিরোইজম ফুটিয়ে তুলতে, দু-চারটা ফাইট দৃশ্য, কমেডি দৃশ্য রাখার চেষ্টা করেছেন। এগুলো করতে গিয়ে প্রায় সময়ই মূল গল্পকে ছেড়াফাটা করতে হয়। এই কাজটা সব পরিচালক-চিত্রনাট্যকার করতে পারে না। যে করতে পারে, সে-তো একদম ফাটিয়ে দেয়। কিন্তু যে করতে পারে না, তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয় উলটো। এটার জন্য দক্ষতা ও অভিজ্ঞাতার প্রয়োজন হয়।

আমার মতে ‘প্রিয়তমা’র ক্ষেত্রে সেই উলটো জিনিসটাই ঘটেছে। পরিচালক একটা খাঁটি রোমান্টিক গল্পের ভেতর হিরো-ভিলেনের রেষারেষিকে বেশি জায়গা দিয়েছেন। এই ছবিতে ভিলেন হিসেবে শহীদুজ্জামান সেলিম তুখোড়, তার প্রতিপক্ষ হিসেবে লুৎফর রহমান জর্জও কম যান না। তাদের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে আমাদের বিন্দু মাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দিকে বেশি ফোকাস করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে সিনেমার গল্প খেই হারিয়েছে, গল্পের ধারাবাহিকতায় একটা ছেদ পড়েছে। সিনেমায় ফাইট সিন গুলোতে ডিজাইনটা পারফেক্ট হয়নি। কমেডি সিন রাখা হয়েছে, কিন্তু কমেডির স্ক্রিপ্ট ভালো হয়নি। সব মিলিয়ে পরিচালক হিমেল আশরাফ শাকিব খানের ভক্তদের জন্য যেসব উপাদান সিনেমাতে রাখতে চেয়েছেন, সেগুলো তিনি ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি। এটাই ছিলো এই ছবির দুর্বলতার দিক। উল্টো ‘প্রিয়তমা’র মূল গল্পটি, এ সিনেমার মূল ইমোশনের জায়গাটি.. সিনেমাতে আসে অনেক পরে, বলা যায় সিনেমার শেষ তৃতীয়াংশে।

প্রিয়তমা’র গল্পটা দিয়ে দর্শকের হৃদয় ছোঁয়ার একটা চেষ্টা করা হয়েছে। শাকিব খান ও ইধিকা তাদের দুর্দান্ত অভিনয় দক্ষতা এই ছবিতে দেখিয়েছেন। যদিও মাঝখানে কিছু অংশ একটু অসংলগ্ন মনে হয়েছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে বড় স্টারের থেকে সবচাইতে এযাবতকালের ম্যাচিউর এবং ন্যাচারাল পারফরম্যান্সটা এখানে দেখা গেছে। নায়িকা চরিত্রে ইধিকাকে প্রথম দিকে মানানসই মনে না হলেও তার অভিনয় দক্ষতা দিয়ে প্রমান করেছেন যে তিনি শুদ্ধি অভিনেত্রী । আসতে আসতে চরিত্রের মধ্যে তিনি ঢুকে পড়েছেন এবং যে সমস্ত জায়গায় ইনটেনসিটি বা যেরকম সিরিয়াসনেস দরকার ছিল যেরকম অসহায়ত্ব দরকার ছিল, বিরহের যে বেদনা দরকার ছিল সেটা তিনি পুরোপুরি ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এবং এই দুজনার কেমিস্ট্রিটা খুবই অসাধারণ  ও চমৎকার লেগেছে।

 সিনেমাটা আরেকটি ভালদিক হচ্ছে এটার দুর্দান্ত ট্রাকে সিনেমাটা শাকিব খানের অন্যান্য সিনেমার অংশ থেকে আলাদা । সত্যি অসাধারণ হয়েছে ছবিটি। শেষ দিকে দর্শকদেরকে এক ঘোরের মধ্যে রেখেছে, ইমোশনালী এ্যাটাচ করেছে, হৃদয় নাড়িয়েছে। নায়িকার মৃত্যু অনেকেই মেনে নিতে পারেনি, শাকিব খানের বৃদ্ধ বয়সের লুক দেখে দর্শকরা খুবই আবেগ তাড়িত হয়ে আপ্লুত হয়েছে। বেশীর ভাগ দর্শক চোখ মুছতে মুছতে, দু:খ ভারাক্রান্ত মনে হল থেকে বের হয়েছেন। দর্শকদের এই ছবির সাথে এ্যাটাচমেন্ট করতে পেরেছেন । এটাই এই ছবির বড় সার্থকতা। তবে দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল নায়ক নায়িকাদের শেষে মিলন হবে যা বাংলা ছবিতে সাধারণত দেখা যায়। এটিই এই ছবির ক্লাইমেক্সও বটে।

সাউন্ড কোয়ালিটি মোটামুটি ভালো, কিন্তু পর্দার খুব বাজে অবস্থা ও ঘোলা। ক্যামেরার কাজ ভালোই হয়েছে। আর কক্সবাজারকে গল্পে সংযুক্ত করতে পারায় এই সিনেমার সৌন্দর্য বেড়েছে, শ্যুট করতে সুবিধাও হয়েছে। তবে এডিটিংয়ে বেশ ভুল-ভ্রান্তি চোখে ধরা পড়েছে। হয়তো তাড়াহুড়ো করতে গিয়েই এই অবস্থা। ডাবিং এও কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে। যাই হোক তার পরেও ছবিটি গল্প ও চমৎকার অভিনয় দক্ষতার গুনে সবকিছু পাশ কাটিয়ে একটি সুন্দর ও ভাল ছবি হিসেবেই উৎরিয়ে গেছে এবং দর্শক মহলে ব্যাপক সাঁড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

‘প্রিয়তমা’ চলচ্চিত্রে আরেকটি ভাললাগার জায়গা ছিল এর গানগুলো। বালাম, প্রিন্স মাহমুদের মতো প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক যে চলচ্চিত্রের সাথে সংযুক্ত, প্রত্যাশা রাখাটাই তো স্বাভাবিক। এটারই প্রতিফলন ঘটেছে গানগুলিতে। ইত্যিমধ্যেই ইউটিউবে ঝর তুলতে শুরু করেছে।

শেষে আরেকটি বিষয়ে না বললেই নয় পরিচালক হিমেল আশরাফ যদি শ্রদ্ধেয় ফারুক হোসেনের লেখা গল্পের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখতেন, গল্প অনুসারে যদি একটি পরিপূর্ণ রোমান্টিক সিনেমা বানাতেন, তাহলে হয়তো ‘প্রিয়তমা আরো ভালো একটা চলচ্চিত্র হতে পারতো। আজকাল আমরা যে যুগে আছি সেখানে বলা হয়ে থাকে ‘কনটেন্ট ইজ দ্য কিং’। কনটেন্ট ভালো হলে এমনিতেই ভালো চলবে, সেজন্যে বিশেষ শ্রেণীর দর্শককে টার্গেট করার প্রয়োজন ছিলনা। আসলে ভালোর তো শেষ নেই। মানুষ ভালো কিছু দেখলে আরো ভালো পাওয়ার প্রত্যাশা বাড়ে। যাইহোক পরিচালক হিমেল আশরাফকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই এমন সুন্দর ও চমৎকার ছবি উপহার দেওয়ার জন্য। চলুন আমরা এবার ছবির দর্শকদের কিছু অভিব্যক্তি শোনি:

‘প্রিয়তমা’ ছবি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি’’  তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী পলক

এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘প্রিয়তমা’ দেখতে স্ত্রী সন্তানসহ সপরিবারে রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সে উপস্থিত হন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তিনি বলেন ‘এই সিনেমাটা এমন একটি সিনেমা যেখানে আমরা যারা চল্লিশোর্ধ্বরা রয়েছি তাদের যেমন সিনেমা, আমাদের যেমন রিলেট করেছে, আমার ছেলে ১৭ বছরের সেও আবেগ তাড়িত হয়েছে।এই সিনেমা সববয়সীদের জন্য।’

 তিনি আরো বলেন, ‘শাকিব খান প্রমাণ করেছে তিনি একজন সুপারস্টার। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাকে আবেগতাড়িত করেছে। আমি নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। তিনি বলেন, ‘‘সবাইকে আমন্ত্রণ জানাবো আপনারা সিনেমা হলে আসুন। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ‘প্রিয়তমা’ দেখুন।

প্রতিমন্ত্রির স্ত্রীও বললেন: ‘‘উনিতে(প্রতিমন্ত্রি) বলে দিলেন কয়েক কথাই। আমারতো এখনো ঘোরই খাটছেনা। আমার চোখ মুখ দেখে আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।’’

আরেক দর্শক নিলুফা ইয়াসমিন চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘সিনেমার শেষ দৃশ্যটি অনেক কষ্টের। দর্শকদের চোখে জল চলে আসে। খুব কেঁদেছি।’

অন্য আরেক দর্শক বলেন, ”শাকিবের জীবনে যত ছবি করছে তার মধ্যে বেষ্ট ছবি এ্‌ইটা।”

আরেকজন মধ্য বয়সক্ এক দর্শক “কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন অনেক সুন্দর। আমার সাত বছরের ছেলেও কেঁদে ফেলছে। খুবই চমৎকার ছবি।

পরিশেষে বলি “ভাল থাকবেন, অন্যকে ভাল থাকতে সহায়তা করবেন। বেশী বেশী করে ভালো মানের বাংলা ছবি দেখবেন। আর আপনাদের মূল্যবান মতামত বা পরামর্শ দিয়ে ইচ্ছেঘুড়ির সাথে থাকবেন। সবার জন্য শুভ কামনা। ঈদ মোবারক।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)