ইউনিভারসিটির লাইফ থেকে ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কিছু লিখার মনের ভিতর একটা তাগিদ অনুভব করছিলাম। কিন্তু কিভাবে যেন লিখব লিখব বলে লেখা হয়ে উঠেনি। সমাজ বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে এই বিষয়টির গুরুত্ব ও গভীরতা অনুধাবনে সুযোগ হয়েছিল এবং সেই নিরিখে এই বিষয়টি সমাজের লোকের কাছে তুলে ধরার একটা অপপ্রয়াস বা অর্থহীন অপলাপ যাই বলুন না কেন! বিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে ইতিহাসের সত্যতাকে পূঁজি করে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি। কারণ আমরা যা কিছু করি না কেন আমাদের ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নিতে হয় এবং সেই আলোকেই আমরা আমাদের ভবিষ্যতের চিত্র দাড় করাতে চেষ্টা করি। আর সেই অতীত ইতিহাসের শিক্ষা থেকেই অভিজ্ঞতার জন্ম।
ভাষা হলো আমাদের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ভাষা কোন জাতি/গোষ্ঠীর সংস্কৃতি অস্তিত্ত্বের মূল শিখর। ভাষার মাধ্যমে সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ ও প্রকাশ। আর কৃষ্টি-সংস্কৃতির অর্থ ব্যাপক। এতে আছে কোন জাতির আচার আচরণ, রীতিনীতি, শিল্পকলা, সমাজ সংগঠন, শিক্ষা, রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবন দর্শন, ভাষা, সাহিত্য প্রভৃতি মানুষের সমস্ত সৃষ্টি। কোন জাতির প্রচলিত আচার-ব্যবহার, প্রথা, রীতি-নীতি, মূল্যবোধ, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ কি, কি ধরণের, এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি কোন জাতির পরিচয় বহন করে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার সংস্কৃতিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘‘আমরা যা তাই সংস্কৃতি” (Culture is what we are) আমাদের অস্তিত্বই সংস্কৃতি। সৃতরাং সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ নিশ্চিন্ন হয়ে যাওয়া, ধ্বংস হয়ে যাওয়া। বেঁচে থাকার জন্যে উৎপাদনকর্ম সম্পাদন করা ও অব্যাহত রাখা যেমন অবশ্য প্রয়োজন, তেমনি একটি জাতির অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংস্কৃতির চর্চা করা, আয়ত্ব করা এবং প্রয়োজনীয় পর্যায়ে উন্নীত করা অপরিহার্য্য।
ইতিহাস কি বলে?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, যে জাতি তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে হারিয়েছে তারাই পৃথিবী থেকে নিশ্চিন্ন হয়ে গেছে। তাদের অস্তিত্বকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেমন আসামের মরান ও ছুটিয়ারা অহোমদের সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজেদের পৃথক পরিচয় হারিয়ে অহোম পরিচয়ে পরিচিত হয়েছে। এই অহোমরাও তাদের ‘শান’ সংস্কৃতি হারিয়ে বঙ্গ কামরূপী সংস্কৃতির মিশ্রণে রুপান্তরিত হয়েছে। পাকিস্তানীরাও জানত যে একটা জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হবে। তাই তারা বাঙ্গালীকে ধ্বংস করতে ভাষার উপর প্রথম আঘাত এনেছিল। কিন্তু বাঙ্গালীরা সে ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিল এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য দূর্বার আন্দোলন ও আত্মাহুতি দিয়েছিল। আর সেই পথ ধরেই জাতীয় চেতনায় উদ্বোদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তি যুদ্ধের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা অর্জন হয়।
মাতৃভাষা সংরক্ষনে ইউনেস্কোর উদ্যোগ
জাতীয় সংঘের অঙ্গ সংস্থা UNESCO ২১ ফেব্রয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা দিয়েছে। ২১ ফেব্রয়ারী ১৮৮টি দেশে পালন করা হয়। UNESCO এ ঘোষণা শুধু ২১ ফেব্রয়ারীর স্বীকৃতি নয়, বরং পুরো পৃথিবীর সব জাতির মাতৃভাষা এবং সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বাকে ধরে রাখার অতুলনীয় পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি বিশ্বের ৬০৬০টি ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। এ ঘোষণায় প্রত্যেক জাতি/গোষ্ঠী সে দেশের সরকারী পৃষ্টপোষকতায় ও সহযোগিতায় তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে সরকারী পর্যায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বার ভাষা ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ বা পৃষ্টপোষকতা লক্ষ্য করা যায় না; ভবিষ্যতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে এ আশা করাও হবে বোকার স্বর্গে বিচরণের সামিল। যে দেশের সরকার দেশে ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বা বা আদিবাসীর অস্তিত্ত্বই স্বীকার করতে চাই না সেখানে সরকারী পর্যায়ে পৃষ্টপোষকতা কিভাবে আশা করতে পারি। আমরা নিজেরাও এ ব্যপারে কোন রকম তাগিদ অনুভব করছিনা বরং দিনে দিনে ঠেলে দিচ্ছি এ ভাষার ভবিষ্যৎকে অস্তিত্ত্বের সংকটময় অশ্চিয়তার দিকে।
মাতৃভাষার প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলা
আমি লক্ষ্য করেছি শহরের অনেক ছেলে মেয়ে গারো/আচিক ভাষা বুঝেনা, বলতে পারে না। এমনকি গ্রামেও বিষয়টা কিছু কিছু লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহরের অনেক গারো পরিবারে পারিবারিক ভাষা হিসাবে বাংলাকে ব্যবহার করে থাকে। ফলে ছেলে মেয়েরা আর গারো/আচিক ভাষা শিখতে পারেনা এবং শেখানোর কোন চেষ্টাও করে না। এমনকি আমরা আমাদের নিজেদের মধ্যে, আমাদের নিজস্ব কমিউনিটির মধ্যে নিজেদের বিষয় নিয়ে যখন আলাপ আলোচনা করি, মিটিং সেমিনার করি তখনও আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষা (গারো/আচিক) ব্যবহার করিনা । কোন কোন অভিভাবক তার ছেলে মেয়ে গারো/আচিক বলতে পারেনা বা জানেনা এটা অন্যকে জানাতে স্বাচ্ছন্দ ও খুব গর্ববোধ করেন। আমি এমনও লক্ষ্য করেছি যে একজন গারো হয়েও গারো/আচিক ভাষা ভালো বলতে পারে না বা মোটেও পারেনা, গারো সংস্কৃতি সর্ম্পকে সে কিছু জানেনা এটা জানাতে কেউ কেউ অহংবোধ ও গৌরবের বিষয় মনে করেন। যা বিকৃত মানসিকতা, নেতিবাচক চিন্তা-চেতনা, চরম মূল্যবোধের অবক্ষয়, জাতীয়তাবোধ চেতনার অভাব থেকে সৃষ্টি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং শংকার বিষয়। আসলে ঠিক উল্টোটা হওয়া উচিত। আমরা আমাদের নিজের ভাষা জানিনা, বলতে পারিনা, বুঝিনা, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু জানিনা এটাতো চরম লজ্জার বিষয়। আমি আমাকে চিনিনা এর চেয়ে বেশী! লজ্জার কি হতে পারে।
এককালের বৈচিত্রর্পর্ণ, সমৃদ্ধ ও বৈশিষ্টময়তায় উজ্জ্বল গারো সংস্কৃতি আজ মিশ্র সংস্কৃতির দ্বন্দ সংকুল আবর্তে নিপতিত। এর অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। এর মূল কারণ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, দূরদর্শিতার অভাব, জাতীয়তাবোধ চেতনার অভাব এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির আগ্রাসন। এর জন্য মূলত: আমরা নিজেরাই দায়ী। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এ ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে; সাথে সাথে আমরাও। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে কোন জাতি তার ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেললে তার ধ্বংস অনিবার্য। এটা বাস্তব সত্যি যে, আমাদের জীবন জীবীকা ও মানসম্মত বেঁচে থাকার জন্য বাংলা ও ইংরেজী ভাষা যেমন অত্যাবশ্যক তেমনি আমাদের অস্তিত্ব ও নিজস্ব স্বত্ত্বাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গারো/আচিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানা, লালন পালন, চর্চা ও রক্ষণাবেক্ষণ একান্ত প্রয়োজন ও অত্যাশ্যক। সুতরাং গারো ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের জন্য অবহেলা, অবজ্ঞার বিষয় নয় বরং এটা আমাদের আত্মা ও অস্তিত্বের বিষয়।
সক্রেটিসের শিক্ষা ও উপদেশ
সক্রেটিস তার স্বদেশবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন ‘‘ভাইসব তোমরা সম্পদ আহরণের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করে প্রত্যেকটি পাথর উল্টিয়ে আচঁড়ে দেখছ; কিন্তু যাদের জন্য তোমরা সমস্ত জীবনের কঠোর শ্রমের ফল রেখে যাবে, সেই সন্তানদের যথার্থভাবে মানুষ করার কতটুকু সময় ব্যয় করছ?” আমাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ত্বের কথা ভেবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে হবে, গড়ে তুলতে হবে প্রকৃত মানুষ হিসাবে। এ বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া উচিত এবং প্রত্যেক অভিভাবক তার ছেলে মেয়েদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি, সমাজের রীতি-নীতি, আদর্শ ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া উচিত। বুদ্ধিগত শিক্ষা আমাদের মস্তিককে উর্বর করে এবং মূল্যবোধের শিক্ষা আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে সমৃদ্ধ করে। বস্তত পক্ষে যে শিক্ষা আমাদের হৃদয়কে সুশিক্ষিত করে না, সে শিক্ষা বিফল।
আমাদের পরিবার, সমাজ ও কর্মস্থলের উপযোগী চরিত্র গঠনের জন্য নীতিবোধ ও নীতি শিক্ষার প্রয়োজন। যে শিক্ষা চরিত্রের সততা, সহমর্মিতা, সাহস, একাগ্রতা, নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের মতো মৌলিক গুণাবলী গঠন করে সেই শিক্ষাই একান্ত প্রয়োজন। কেবল ডিগ্রীর মানদণ্ডে মাপা শিক্ষা নয়, প্রয়োজন মূল্যবোধের শিক্ষা। যে শিক্ষা নিজের সমাজের প্রতি, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি, মূল্যবোধের প্র্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শেখায় না, সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি বিবেককে জাগ্রত করে না সে শিক্ষা মূলত: ব্যর্থ। জোরের সঙ্গে বলা যায়, যে ব্যক্তি নীতিবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত, তার খুব উচ্চ ডিগ্রী নেই, অথচ নীতিবোধ বর্জিত ব্যক্তির থেকে জীবনে উন্নতি করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। চরিত্র গঠন এবং নীতি ও মূল্যবোধের শিক্ষা যে সময় বাচ্চারা বড় হয়ে ওঠে সেই সময়েই দেওয়া ভালো, কারণ তখন তাদের মনে কোনও পূর্ব নির্দিষ্ট ধারণা থাকেনা।
পৃথিবীতে দু’রকমের মানুষ আছে। একরকম যারা সব কিছু গ্রহণ করে, দুই যারা সব কিছু দিয়ে দিতে পারে। যারা নিতে জানে তারা খায় ভালো; সংকীর্ণচিত্ত ও দূর্বল মনের অধিকারী। জীবনটা আমার, আমার জীবনটা নিয়ে আমি যা ইচ্ছা তাই করব এ ধারণার পূজারী। আর যারা দিতে জানে তারা ঘুমোয় ভাল। যারা দিতে জানে, তাদের আছে প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ, দূরদুষ্টি সম্পন্ন সুশৃঙ্খল জীবন, নিজের ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি, রীতি নীতি, আদর্শ মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ সর্বপূরি একটি ইতিবাচক মনোভাব এবং তারা সমাজ সেবায় আগ্রহী। প্রত্যেক মানুষেরই কিছু নেওয়ার প্রয়োজন হয় এবং নিতেও হয়। কিন্তু একজন সুস্থ মানসিকতার প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কেবল মাত্র গ্রহণ করে না দেওয়ারও চেষ্টা করে। আমরা এই দুই ধরণের মধ্যে কোনটির মধ্যে আছি। যদি প্রথমটির মধ্যে থাকি, তাহলে ধরে নিন আমরা পথভ্রষ্ট, বিপদগামী নিশ্চিত ধবংসের দিকে যাচিছ। আমাদের রাস্তা এখনই, এই মূহুর্তে পরিবর্তন করা দরকার।
তাহলে আমাদের কি করা উচিত ?
সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির সত্ত্বা আর ভাষা হচ্ছে তার প্রধান ধারক, বাহক ও মাধ্যম। এ কারনে জাতির অস্তিত্ত্বের জন্য ভাষা ও সংস্কৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে জাতি নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে যত্নশীল, মূল্যবোধ আরোপ করে, সচেতনভাবে সেগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়, সেই জাতির অস্তিত্ত্ব এবং ভিত্তিমূল খুবই মজবুত হয়। তাই গারো জনগোষ্ঠীর নিজেদের প্রয়োজনে ও অস্তিত্ত্বকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির সুষ্ঠূ সংরক্ষণ, লালন পালন ও বিকাশ সাধন করা আমাদের পবিত্র ও আবশ্যকীয় দায়িত্ব।
নিজস্ব পরিবেশে আলোচনায়ঃ
নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা, সভা, সেমিনার, বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ট্রেনিং, ওয়ার্কসপ প্রভৃতি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির আদলে এবং নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করা উচিত। এতে আমাদের বুঝতে যেমন সহজ হবে, তেমনি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির স্টাইল ও ভাষা ব্যবহারের ফলে এ ভাষার ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধন এবং চর্চা হবে।
পারিবারিক আলোচনায়ঃ
পরিবারে যখন আমরা কথা বার্তা বলি তখন যেন আমরা সবসময় আমাদের নিজস্ব ভাষা (গারো/আচিক) ব্যবহার করি, তাহলে ছেলে মেয়েরা আমাদের থেকে শিখবে। ছেলে মেয়েরা পিতা মাতার কাছ থেকে কোন কিছুর ব্যখ্যা চাইলে তার ব্যাখা যেন গারো/আচিক ভাষাই দেওয়া হয়. এতে হবে কি ছেলে মেয়েদের আর আলাদা করে গারো/আচিক ভাষা শিখাতে হবে না।
সচেতনতা বৃদ্ধিঃ
সমাজের সর্বস্তরের লোকের প্রতি ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সমাজে যারা বুদ্ধিজীবি, চিন্তাবিদ, সমাজসেবী তারা এগিয়ে আসতে পারে। তারা তাদের লেখনির মাধ্যমে, সভা সেমিনারে বক্তব্য দানের মাধ্যমে সচেতন করে তোলার পেছনে বৃহৎ ভূমিকা রাখতে পারে। ভাষা হারিয়ে গেলে, সৃংস্কৃতি হারিয়ে যাবে, সাথে সাথে আমাদের মুল্যবোধ, নীতি ও আদর্শ গুলিও। যার চুরান্ত পরিণতি আমাদের অস্তিত্বের সংকট। আমাদের গারো সমাজের বিভিন্ন সংগঠন যেমন টিডব্লিউএ, বাগাছাস, গাসু আাবিমা এ ধরণের সংগঠনগুলো সক্রিয় এবং কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারে।
ল্যাংগুয়েজ ও সাংস্কৃতিক ক্লাব গঠন করে
শহরে বসবাসরত ছেলে মেয়েরা নিজের বাসা ছাড়া গারো/আচিক ভাষা বলার খুব একটা সুযোগ নেই। ঢাকা শহরের গারো ছেলেমেয়েরা গারো/আচিক ভাষা না পারার এটাও একটা বড় কারণ। এক্ষেত্রে শহরে অবস্থানরত ছেলে মেয়েদের জন্য গারো ল্যাংগুয়েজ ও সাংস্কৃতিক ক্লাব করা করা যেতে পারে। ঢাকার নকমান্দি কমিউনিটি সেন্টার ঢাকায় বসবাসরত গারো ছেলে মেয়েদের জন্য হতে পারে একটি আদর্শ স্থান এবং নকমান্দির কতৃপক্ষ এ ব্যপারে বৃহৎ ভুমিকা রাখতে পারে। এখানে ছুটির দিনে বা অবসর সময়ে তারা সবাই এসে গারো/আচিক ভাষায় কথা বলবে, চেষ্ট করবে সমাজের বিভিন্ন বিষয় সঙ্গতি অসঙ্গতিগুলো নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে গারো/আচিক ভাষায় আলাপ আলোচনা করতে পারে। এতে করে গারো/আচিক ভাষার চর্চার পাশাপাশি সমাজের যে সমস্যা গুলো নিয়ে তারা আলাপ আলোচনা করবে তার সমাধানের পথ বের হয়ে আসতে পারে এবং তাদের জ্ঞানের উৎকর্ষতাও বৃদ্ধি পাবে; তাদের নিজেদের মধ্যেও সুন্দর একটা সম্পর্ক তৈরী হবে। যোগাযোগের শক্তিশালী নেটওর্য়াক তৈরী হবে।
জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বোদ্ধকরণঃ
জাতীয়তাবোধে জাগ্রত হলে তার নিজের জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জন্মাবে এবং তা রক্ষা ও সংরক্ষণের তাগিদ অনুভব করবে। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য জাতীয়তাবোধ উদ্বোদ্ধ হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
গারো বর্ণমালা তৈরীঃ
ভাষার উৎকর্ষ ও স্থায়িত্ব লাভের জন্য বর্ণমালা অপরিহার্য। এই বর্ণমালার সাহায্যে ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে লিপিবদ্ধ করে রাখি। তাই বর্ণমালার গুরুত্ব অত্যধিক। আর সেই স্বার্থে গারো/আচিক ভাষার বর্ণমালা তৈরী অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। সমাজে যারা গবেষক, শিক্ষাবিদ তারা এ বিষয়ে এগিয়ে আসলে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি লাভবান হবে।
সাংস্কৃতিক মূল্যবোধঃ
সাংস্কৃতিক রক্ষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। জাতির অস্তিত্ত্বের জন্য টিকে থাকার জন্য এবং স্বাতন্ত্র্যকে রক্ষা করার জন্যে সংস্কৃতি যে গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্য প্রয়োজনীয় তা উপলদ্ধি করতে হবে।
এছাড়াও নিম্নলিখিত বিষয়ে যত্নবান হওয়া আমাদের একান্ত জরুরী:
- সামাজিক রীতিনীতি ও আইন কানুনসমূহ যথাযথ ও কার্যকরভাবে সমাজ জীবনে প্রয়োগ চর্চা ও প্রতিপালনের জন্য যত্নবান হওয়া।
- বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো ছিটানো সংস্কৃতির উপজীব্যসমূহের চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলো সংগ্রহ, পূণরুদ্ধার যথাযথ সংরক্ষণ ও অনূশীলনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
- ভাষা ও সংস্কৃতির সুষ্ঠূ সংরক্ষণে লালন ও বিকাশের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা লাভের জন্য গবেষণাকর্ম পরিচালনা করা।
- ধারাবাহিক অথচ মুখে মুখে চলে আসা শিল্প সাহিত্যের উপজীব্যসমূহের যথাযথ ডকুমেন্টেশনের এবং প্রচারের ব্যবস্থা করা।
- ভাষা ও সংস্কৃতির উপজীব্যসমূহ চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, ফিচার, ফিল্ম ইত্যাদির মাধ্যমে ধারণ করে স্থায়ী সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
- ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরিচ্ছদ ও অলংকারাদি উৎপাদন ও ব্যবহারে আরোও মনোযোগী হওয়া।
- গারো সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা ও ছেলে মেয়ে /অন্যান্যদের জানতে আগ্রহী করে তোলা, জানতে সাহায্য করা। এক্ষেত্রে গারো সমাজ সংস্কৃতির ইতিহাসের সহায়তা নেওয়া।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলা। সম্ভব হলে শিক্ষা সূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা (এক্ষেত্রে বিভিন্ন বেসরকারী/মিশনারী স্কুল গুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে)
- অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নতিকরণ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।
পরিশেষে বলি আমাাদের সংস্কৃতি আমাদের অস্তিত্ত্ব ও জীবন পথ। Garo culture is the way of life of Garos. আর এই way বা পথ যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে একদিন হারিয়ে যাব। আমরা কেউ চাই না আমাদের অস্তিত্ত্ব বিলীন হয়ে যাক। আমরা চাই অপরাপর জাতির সাথে মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও নিজস্ব পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে। আর তাই যদি হয়, তাহলে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি, আদর্শ ও মূল্যবোধকে উৎকর্ষ বিধান ও সমুন্নত রাখতে সকলের একান্ত যত্নবান হওয়া উচিত।

